Wednesday, January 31, 2018

অনুকরণীয় অনুসরণীয়

সকলেই অনুকরণীয় হয় না।  মানুষ সবাইকে অনুকরণ বা অনুসরণ করে না। অনুকরণীয় বা অনুসরণীয় হবার মতো যোগ্যতা বা গুণাবলী রয়েছে মানুষ কেবল তাদেরকেই অনুসরণ করে। 

বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীল, শৈল্পিক গুণাবলী সমূহ আমাকে মুগ্ধ, অনুপ্রাণিত এবং প্রভাবিত করেছিল।
শব্দে শব্দ গেঁথে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম, কিছু গল্প লিখেছিলাম, যদিও এ সকলই বাল্যকালের কথা, পাণ্ডুলিপি গুলো হারিয়ে গেছে সেই কবে কালের স্রোতে।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে আঁকা ছবি দেখে প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম ছবি আঁকা খুব সোজা, ছবি আঁকায় ভুল বলে কিছু নাই। 
তবে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুকরণ বা অনুসরণ করিনি, আমি শুধু তার মতো সৃজনশীল গুণাবলী সমূহ আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছিলাম যা আমায় মুগ্ধ করেছিল। আমিও ছবি আঁকি, আমিও কবিতা লিখি এর মানে আমি তাকে অনুকরণ বা অনুসরণ করি।  আমি নিশ্চিত বলতে পারি আমার মতো আরো অনেকেই আছে যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীল গুণাবলীর দ্বারা প্রভাবিত। 
আমার আঁকা ছবি, আমার কবিতা বা লেখা আমার ভাবনা আর চিন্তা চেতনা আমার মত করে আমার ভাষায় প্রকাশ করি এটাই আমার মৌলিকত্ব। 

বাল্যকালে মোনালিসা পেইন্টিংটাকে একটা স্থির আলোকচিত্র ভাবতাম। কৈশোরে এসে যখন জানলাম এটি স্থির আলোকচিত্র নয় প্রকৃত পক্ষে এটি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা একটি তৈলচিত্র। তখন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে একজন মানুষের পক্ষে কিভাবে এতো নিখুঁত এবং প্রাণবন্তভাবে একজন মানুষের প্রতিকৃতি আঁকতে পারে!?
এরপর আমি প্রতিকৃতি আঁকতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। সে সময় দিনরাত ছবি আঁকতাম, ছবি আঁকা ছিল আমার একমাত্র নেশা। সে সময় প্রায় শতাধিক প্রতিকৃতি ক্যানভাসে বা রংতুলিতে এঁকেছিলাম। 

যৌবনে এসে শ্রদ্ধেয় শিশির ভট্টাচার্যের আঁকার ধরণ এবং কার্টুন বা ক্যারিকেচারের প্রান্তরেখা (আউটলাইন) দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখন কলম ছিলো আমার কার্টুন আঁকার একমাত্র হাতিয়ার, তাই তার মতো করে প্রান্তরেখা আঁকার চেষ্টা করতাম। শিশির ভট্টাচার্যের চৌকষ এবং পেশাদারী অঙ্কন শৈলী আমার সবচেয়ে প্রিয়। 

ঐ একই সময় মামুন হোসাইন ভাইয়ার আঁকা কার্টুন দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তার আঁকা চরিত্রগুলির অভিব্যক্তি এবং উপস্থাপন দেখে মনে হয়েছিল কার্টুন আঁকা খুবই সোজা।  
শুরুর দিকে মামুন হোসাইনের আঁকার ধরণ অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম। পরে অবশ্য আমার মতো করে আঁকতে শুরু করি এবং নিজস্ব আঁকার ধরণ দাঁড় করি।   

আমি মনে করি প্রতিটি মানুষের বিশেষ গুণাবলী রয়েছে যা কাউকে না কাউকে মুগ্ধ করে। 
কখনো যদি শুনি আমাকে কেউ আমার বিশেষ গুণাবলীর জন্য অনুকরণ বা অনুসরণ করে তাহলে আমি খুশি হই এই ভেবে যে একজন মানুষকে দেয়ার মতো বা অনুপ্রাণিত করার মতো আমার কিছু আছে। 

মুহূর্তের আলিঙ্গনে

বছর খানেকের তরে আমি ভুলে যেতে চাই,
কে আমি, কোথায় ছিলাম, কোথায় এলাম,
কি হারালাম, কি পেলাম,
কোনটা নামি, কোনটা দামি। 

উদাসীন আমি, ভাবনা ছিল কম জীবন, ভবিষৎ প্রসঙ্গে
অল্পতেই ছিলাম তুষ্ট, সন্তুষ্ট।
চলতাম সময় স্রোতে বেহুঁশে গা ভাসিয়ে। 
ঋতুর পরে ঋতু এসে চলে গেছে, আমি থেকেছি
সকল প্রহরে একই ঘরে, একই তরে, বেখেয়ালিতে।
বিচ্ছিন্ন ছিলাম, ছিলাম বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।
ছিলাম আমার পথে একা,
অচেনা সে পথে বসন্ত দেয়নি দেখা।
হিমেল হাওয়া দিয়েছে দোলা,
নিযুত বছর ধরে যেভাবে দিয়ে চলেছে
সবার চুলে, সবার গালে। 

যে মুহূর্ত চলে গেছে সে তো আর আসবে না ,
হয়তো আসবে নতুন মুহূর্ত, হয়তো সেটি হবে উত্তম
অথবা অন্য রকম।
আমি প্রস্তুত নতুন মুহূর্তকে আলিঙ্গন করতে।

Friday, January 12, 2018

শৈশবের নীতি কথা

পরিশ্রমে ধন আনে
পূন্যে আনে সুখ।
আলস্য দারিদ্র্য আনে
পাপে আনে দুঃখ।
উপরের কথা গুলো আমার নয়, আমার নানী প্রায়ই কথা গুলো বলতেন এবং নানীর ঘরের দেয়ালে লিখে বাঁধানো ছিলো। কথা গুলোর রচয়িতা আমার অজ্ঞাত। তবে কথাগুলো যারই রচিত হোক না কেন, কথা গুলো সার্বজনীন অর্থবহ চিরন্তন সত্য কথা।
আমার শৈশবে নানীর মুখে ছন্দময় আরো অনেক কথাই শুনেছি। তাঁর সকল কথার অর্থ আমি তখন বুঝতাম না তবে এখন সব কিছুই বুঝতে পারি। নানীর মুখে শোনা উপরের কথা গুলোকে আমি জীবন দর্শন মনে করি।

Saturday, December 30, 2017

দূরত্ব

একটা সময় ছিল যখন পারস্যের কন্যার সাথে প্রণয় ছিল। যদিও দুজন ছিলাম দুই মহাদেশের বাসিন্দা, দূরত্বের কাছে মাথা নোয়াবার নই; এমনি ছিল মনোবল। একে অন্যের সাথে দেখা করার জন্য সকল বাঁধা পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে, দূরত্বকে পিছনে ফেলে নয়নে নয়ন মেলাতে বছরে দুই একবার পাড়ি জমাতাম দুই মহাদেশের মিলন স্থলে, তুরস্কে।
দুজন একসাথে, আমার হাত তাঁর বগলে, একসাথে  ঘুরতাম - বেড়াতাম ইস্তানবুল, আন্তালিয়ার পথে প্রান্তরে, নীল আকাশের নিচে, সাগর তীরে, অরণ্যে - লোকালয়ে, রাস্তায় মানুষের ভিড়ে, পারস্য কন্যা আমার হাত ছাড়তোনা কখনোই।
পাথরের আসনে দুজনে মুখোমুখি বসে জোস্না রাতে, হাতে হাত রেখে পূর্ণিমা দর্শন, জোস্নায় স্নান। ভূমধ্যসাগরের জল চিকচিক করতো চন্দ্র আলোয়, হাওয়ার আবেশে, দুইজন দর্শক
আমি আর সে, অনুভূতিরা গভীর হতো রাতের সাথে।

বিদায় বেলায় তাঁর মাথা আমার কাঁধে, ভিজতো গাল তাঁর নয়ন জলে তবু ঠোঁটে হাসি কথার ছলে, যেতে হবে ছেড়ে তবু মন বাঁধ সাধে, আমি সান্তনা দিতাম; আবার দেখা হবে বছর গড়ালে।
হাওয়াই জাহাজ উড়াল দিতো, হয়ে যেত সে মেঘের আড়ালে, চোখের আড়ালে।

বাড়ি ফিড়ে শুরু হতো আবার দুজনের দিন গোনা। দিন গুনতে গুনতে, একদিন দিন আবার আসতো ফিড়ে, দুজনে মিলতাম, হাতে হাত রাখতাম সাগর তীরে, চাঁদনী রাতে, আমার হাত তাঁর বগলে শত মানুষের ভিড়ে।


এভাবে চলতে চলতে একদিন দিন আর ফিড়ে আসেনা, পারস্য কন্যা আর আগের মতো হাসে না, দূরত্বকে তাঁর হঠাৎ ভয়, মনে সংশয়।
ভয়কে করলে ভয় ফলাফল পরাজয়।
অবশেষে একদিন দূরত্বেরই হলো জয়, আমার পরাজয়।

Sunday, December 10, 2017

শৈশব এবং স্নো

ইন্টারনেটে ছবিটা খুঁজে পেলাম। ছবিটা দেখা মাত্র কিছুক্ষণের জন্য আমি শৈশবে ফিরে গিয়েছিলাম। আমার সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবে।

আমাদের তখন বাড়ী ছিলো। ঘরে গোল কাঁচের ড্রেসিং টেবিল ছিলো। ড্রেসিং টেবিলের এক পাশে সাজানো থাকতো চুড়িদানী। সেই চুড়িদানীতে আমার মায়ের হাতের বিভিন্ন রকমের চুড়ি সাজানো থাকতো, রঙ-বেরঙের কাঁচের চুড়ি, বেদের চুড়ি। মা সেগুলো বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়া হাতে পরতেন না। আমি চুড়ি গুলো নেড়েচেড়ে দেখতাম আর ঝনঝন শব্দ শুনতাম এরপর যেমনটা ছিলো ঠিক তেমনটি করে সাজিয়ে রেখে দিতাম।
সেই ড্রেসিং টেবিলের অন্যপাশে আমি জীবনে প্রথমবারের মত এই স্নোর প্যকেটটি দেখেছিলাম। আমি তখনও লিখতে পড়তে শিখিনি, তাই প্যাকেটের গায়ে কি লেখাছিল তা সে সময় আমি বুঝতাম না। প্যাকেটা কেবল হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতাম; একপাশে সুন্দরী এক রমনীর ছবি অন্যপাশে অট্টালিকা, দেবদারু গাছের মত গাছ, আর উচু সাদা কিছু একটা হবে। সব চিন্তাম কিন্তু সাদা অংশটা কি তখন তা বুঝতাম না। মা কে জিজ্ঞাসা করার পর মা বলেছিলেন সাদা অংশটা হল পর্বত যা স্নো পরার কারণে সাদা হয়ে গেছে।

শৈশবে স্নো বলতে বুঝতাম সেই ছোট্ট কৌটার সাদা পদার্থ, যা আঙুলে নিয়ে গালে মেখে মা রূপ চর্চা করতেন এবং আমার গালে মেখে দিতেন।

সময়ের সাথে সাথে স্নোর সজ্ঞা আমার কাছে পাল্টে গেছে।
এখন আমার আকাশ হতে প্রায়শই সকাল বিকাল স্নো ঝরে। এ স্নো ঠান্ডা, হিম শীতল। এ স্নোতে সুবাস নেই, কেউ গালে মেখে রূপ চর্চা করে না।

Wednesday, November 29, 2017

গোঁফ ভ্রম

কিছু দিন আগে হঠাৎ করে গোঁফ রেখেছিলাম।
গোঁফের কারনে প্রথম দেখাতেই অনেকে আমাকে দক্ষিণ ভারতীয় তামিল নয়তো শ্রীলঙ্কান ভেবে বসে থাকতো।

এমনটাই হয়েছিলো বেশ কদিন আগে নরওয়েজিয়ান শিল্পীদের সাথে বড় দিনের মধ্যাহ্ন ভোজের অনুষ্ঠানে।

আমার পাশে বসা এক শিল্পী আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় থাকেন? জবাবে বললাম দ্রবাক।

তিনি বললেন দ্রবাক সুন্দর শহর, কার্টুনিষ্টদের শহর, কার্টুনিষ্ট গ্যালারী আছে, বাংলাদেশী এক কার্টুনিষ্ট আছে যিনি নিজ দেশে কার্টুন এঁকে জেল খেটেছিলেন, নির্যাতিত হয়েছিলেন তিনিও আপনার মত দ্রবাকেই থাকেন।

আমি মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি ঐ কার্টুনিষ্টকে চেনেন?

তিনি জবাবে বললেন, না কখনো দেখা হয়নি তবে তার সম্পর্কে পত্রিকায় পড়েছি।

আমি মুচকি হেসে বললাম, আচ্ছা।

আমাকে মুচকি মুচকি হাসতে দেখে, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি তাকে চেনেন? মানে, ঐ বাংলাদেশি কার্টুনিষ্ট কি আপনার বন্ধু?

আমি বললাম, জ্বি না, তিনি আমার বন্ধু নন, আমিই তিনি।

আমার জবাব শুনে তিনি নড়েচড়ে বসলেন এবং উচ্চ স্বরে হাসতে হাসতে বললেন, সত্ত্যি! আপনিই সেই কার্টুনিষ্ট?

উনার অট্ট হাসির কারনে পাশে যারা বসেছিলেন তারা কথোপকথন থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ঘটনা কি?! এতো হাসির কি হলো?

তখন তিনি হাসি থামিয়ে, আমাকে দেখিয়ে বললেন, আমি এর কাছে এর গল্পই করছিলাম। এবং তাদেরকে আমার সম্পর্কে বিস্তারিত বললেন।


পরে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে, প্রথমে আমাকে দেখে দক্ষিণ ভারতীয় তামিল বা শ্রীলঙ্কান ভেবেছিলেন।

Sunday, September 17, 2017

পরোপকার - ১

গতকাল অসলো থেকে বাসায় ফিরছিলাম। বাসে একজন সত্তুরর্ধো এরিত্রিয়ীন মহিলাকে দেখলাম কুড়ি বা পঁচিশ কেজি ওজনের একটা বস্তা ভর্তি চাউল কিনে বাসে উঠেছেন। বস্তাটি কোথায় রাখবেন তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। আমি তাকে বস্তাটি এক জায়গায় রাখতে সাহায্য করলাম। তিনি আমার পাশের সিটে এসে বসলেন। 
এরপর তিনি যখন গন্তব্যস্থলে এসে বাস থেকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন আমার কাছে চাউলের বস্তাটি নামিয়ে দেওয়ার জন্য বিনীতভাবে সাহায্য চাইলেন। 
আমি তাকে বস্তাটি নামিয়ে দিলাম। 
তিনি আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ, আপনি অনেক দয়ালু। 

আমি নিয়মিত চেষ্টা করি মানুষের সামান্যতম উপকার হলেও করতে। 

মানুষের মুখে হাসিমাখা প্রসংশা আমার জন্য বড় পাওয়া।